রবিবার, ২ জুন, ২০১৩

সাভার ট্রাজেডি : নারকীয় হত্যার দুয়ারে দেখছি লাশের মিছিল

বুধবার হতে চলছে সাভার জুড়ে শুধু শোকের মাতমকান্নার আহাজারি, গগন বিদারি স্বজন হারানোর আর্তনাতবাতাসে ছড়াচ্ছে ধসে যাওয়া ভবন পিষ্ট হওয়া লাশের র্দূগন্ধজীবিতরা ভিতর থেকে উদ্ধারের জন্য করছে করুণ আকুতিউঠে আসছে উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের ভবন চাপায় পিষ্ট হওয়ার বীভৎষ বর্ণনা

যা শুনলে শরীর ঝাকিয়ে উঠেলোমকুপ জেগে উঠেদুচোখের জল বুক ভেঙ্গে ঝরণার মতো উদগত হয়দৃশ্যমান আয়নায় ফুটে উঠে যদি আমি এই ভয়াবহ অবস্থায় উপনিত হতাম; কী অবস্থা হতো? যে ধসে যাওয়া ভবন মাটির সাথে মিশে গেছেদেওয়াল, ছাদ ধসে চাপা দিয়েছে হাজার হাজার শ্রমিকদেরকী ভয়ংকর অবস্থা! প্রাকৃতিক দূর্যোগ হলে একটা কথা ছিল৬/৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও একটা ব্যাপার থাকতো

কিন্তু সেটা হয়নি, এমনি এমনি ধসে পড়লোভয়াল এক মৃত্যুকুপে গ্রাসে পরিণত করলো হাজার হাজার কর্মজীবি শ্রমিকদেরযাদের কায়িক পরিশ্রমের অর্থ দিয়ে এই বিলাস বহুল ঢাকা শহরে বড় বড় ইমারত গড়ে উঠা২ তালা থেকে শুরু করে ৩..৪..৯..২২ তলা সুদৃশ্য দালান কোঠাযেখানে বিলাসবহুল জীবন কাটায় শ্রমিকের রক্তচোষা একশ্রেনীর ক্ষমতাসীন মানুষরা

আর শ্রমিকরা কাজ করে জীর্ণশীর্ণ, দূর্বল সব বিল্ডিংগুলোতেযেখানে জীবন নাশের প্রবল ভয়, যেকোন দূর্ঘটনায় শিকার হওয়ার থাকে উপক্রমজীর্ণ-দূর্বল ইমারত ধসে পড়লে মালিকের তো আর ক্ষতি নেইতার থাকার বিলাসবহুল ভবনটা আর ভাঙছে নাশ্রমিকরা তো মশা কিংবা মাছির সমতুল্যথাপ্পর দিলে মেরে ফেলা যায়, কোন কৈফিয়ত দিতে হয়না

কিছু শ্রমিক মারা গেলে আফছোস কিসের? নতুন শ্রমিক দিয়ে কাজ শুরু হবেকিন্তু এদের তো কোন স্বজন এই শ্রমিক হয়ে এই মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হয়নাএই শ্রেনীর মানুষদেরই আমরা দেবতার মত পুজা করিপা ধরে খেয়ে পড়ার জন্য পা ধরিচাকরির জন্য হাত বাড়াইহায়রে এই পাষন্ড হৃদয়, সিমেন্ট-কংক্রিটের মিশ্রণেই গড়ে উঠা মনটাকার জোরে হাওয়া উড়েন

খানকি-মাঙ্কি নিয়ে নাইট ক্লাবে মদের আস্তানায় পড়ে সময় কাটানদেহ প্রশান্তির জন্য কত আয়োজনফ্যাক্টরির জন্য শ্রমিক প্রয়োজন, লোভের জন্য শ্রমিকের ঘামের প্রয়োজনআর শ্রমিক যখন প্রতিবাদ জানায়, তখন তার জন্য ঘাড় ধাক্কা দেওয়ার জন্য লাঠির প্রয়োজনজীবন তো শুধু মৃত্যুর জন্য না! প্রত্যেকেরই সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন থাকেসেই সুন্দর স্বপ্ন বুননের জন্য গ্রাম ও তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছুটে আসে এই ইট-পাথরের গড়া যান্ত্রিক শহরে

জীবনের বড় কোন লক্ষ্য নয়, স্বাভাবিকভাবেই বেঁচে থাকতেই পারলেই হয়মোটা কাপড়, মোটা ভাত আর পরিবারের সামান্য কিছু স্বচছলতার স্বপ্ন নিয়ে চাকরি নেয় এইসব গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানেকিন্তু সেই স্বপ্ন-রঙিন গড়তে চাওয়া যদি মালিকদের নির্মম অবহেলায় তছনছ হয়ে যায় তখন! যে মালিকদের শ্রমিকরা দেবতা মানেসেই দেবতাই যদি হয় রক্তচোষা ভয়ংকর খাদক! হ্যাঁ আজ তাই ঘটেছে

সাভারের রানা প্লাজার পাঁচটি ফ্যাক্টরির মালিক ও ভবন মালিকের চরম অবহেলা ও চোখ রাঙানিতে স্মরণকালের এই ভয়াল ট্রাজেডির শিকারে প্রাণ দিতে হলো শশ শ্রমিকদেরআহতরা কেউ পঙ্গু জীবনে ফিরে পরিবার আর দেশের জন্য বেকারের অভিশাপ হয়ে থাকবেছোট্ট একটা স্বপ্নের কত বিশাল ট্রাজেডি! ধ্বংসস্তুপের মৃত্যুর দুয়ার খোলে এই যান্ত্রিক শহরের জীবন দংশনের প্রভু হত্যাকর্তারা !!


টিভির পর্দায় রির্পোটের হিরিকসরাসরি প্রচারপত্রিকার পাতায় পাতায় ধসে যাওয়া রানা প্লাজার পিষ্ট হওয়া নিহত-আহদের রক্তাক্ত শরীরের ছবিঅনলাইন ও প্রিন্টমিডিয়ায় এই নিয়েই কথা বলার ছড়াছড়িঅনেকে অনেক কথাই বলছেনসাভার ট্রাজেডিকে ভিন্ন ভিন্ন ভয়ংকর স্থানরুপে দেখা হচ্ছেবিভিন্ন বিশেষণ! কেউ বলছেন সাভার যেন এক ভয়ংকর মৃত্যুনগরী!

কেউ বলছেন মৃত্যুকুপ; কেউ বলছেন হত্যার শহর আবার কেউ বলছেন মৃত্যুর কারখানাএকটা ভবনে পাঁচটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিশ্রমিকের সংখ্যা কেউ বলছেন প্রায় পাঁচ হাজার তারও উর্দ্ধেগত ২৫ এপ্রিল প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম ছিল-ডেকে এনে শত প্রাণ হত্যা

তারই নীচে সাংবাদিক আশীষ-উর-রহমানের রির্পোট-মৃত্যুর কাছে জীবনের কোলাহলদুইটি চোখে পড়ার মতোমনে সমবেদনা জাগানোর মতোমৃত্যুকুপে আর কত মানুষদৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ছিল (২৬ এপ্রিল); আজ সকাল সাড়ে নয়টায় চ্যানেল টোয়েন্টি ফোর এর সরাসরি খবর দেখলাম সাভারের প্রকৃতিতে ভেসে বেড়াচ্ছে লাশের গন্ধউদ্ধার কাজ চলছে

১৯ জনের মত আজ উদ্ধার করা হয়েছে দেখলাম বিভিন্ন অনলাইন নিউজগুলোতেব্লগে, ফেসবুকে মিনিটে মিনিটে সাভার ট্রাজেডির উদ্ধার নিউজের আপডেট ভরে যাচ্ছেউদ্ধারের জন্য তরিত গতির প্রয়োজন, উদ্ধারকৃতদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, শুকনো খাবার, কাপড়সহ অনেকে লিস্ট করে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন ফেবু বন্ধুরা

কয়েক বন্ধু মিলে ফান্ডের টাকা জড়োর উদ্দেশ্যে মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ, ডাচবাংলার নাম্বারও ব্লগে, ফেসবুকে পোষ্ট করছেনকেউ কেউ লিখছেন ঘৃণার ভাষায় দেশ পরিচালনাকারী, বিত্তশালীদের উদ্দেশ্য করেহাজারও লেখায় ঘৃণা-ক্ষোভের তীক্ষ্ম ভাষামালিকের কঠোর সমলোচনা, গ্রেফতারের দাবিতার মধ্যে ক্ষমতাসীন সরকারের কিছু মন্ত্রী অসংযত ভাষা প্রয়োগের তীব্র নিন্দা

সবার চোখে অশ্রুঝরা জলআহত কন্ঠসাভারের লাশের সারি দেখে হতভম্ব গোটা বিশ্বওএ যেন নরকের দুয়ার খুলে মৃত্যুর কারখানা গড়া হয়েছেভবন ধসে এত প্রাণের লাশ স্মরণকালের এটাই বড় রেকর্ডএই হত্যার কারিগরদের কি বিচার হবে না? মালিকদের নাকি বিচার হয়নাইনারা আড়ালে মৃত্যুর সানাই বাজাতে পারেনমৃত্যুর কারখানা গড়তে জানেনশ্রমিকের তাজা রক্ত ঝরিয়ে লাশের ওপর দিয়ে হেটে যেতে পারে সামান্য কিছু টাকা ছিটিয়ে

জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ভস্ম করে দিতে জানেনমৃত্যুর দায়মুক্তি হতে গোপনে প্রশাসন, সাংসদদের বিবেক ও আদালতের আইনজীবিদের কিনে পকেটে ভরে রাখতে পারেনঅথচ ইনারাই নাকি অর্থের দিক দিয়ে দেশের মালিক

জনগন তাদের পেয়ে দেবতা মনে করে মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে তালি দেনতোমার স্যার আমার স্যার স্লোগানে স্লোগানে মুখে ফেনা পর্যন্ত তুলতে পারেসামনের আসনে, মসজিদ-মন্দিরে প্রথম কাতারে তাদের বসার আসন হয়কী চমতকার এই মানুষগুলো!

সাভারের ভয়াল ট্রাজেডি তথা মৃত্যুনগরী বিশেষনে বিশিষ্ট কিছু নাগরিক জোরে সোরেই আওয়াজ দিয়েছেনকিন্তু মানবাধিকার অধিকারের চেয়ারম্যানকে দেখতে পাচ্ছি নাএই ভয়াল ট্রাজেডির ধ্বংসাত্মক ঘটনার স্থান দেখতে মাননীয় প্রধামন্ত্রীও সেখানে পা রাখেননিমধ্যরাতের টক শোর কথা তিনি সমালোচনা করে বলেছেন-টকশোতে বড় বড় কথা না বলে উদ্ধার কাজে লেগে পড়ুনকিন্তু তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও স্থানীয় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর নানক ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছাড়া ঘটনাস্থলে কাউকে দেখতে না পেয়ে অবাক হয়েছেন সবাইপ্রধান মন্ত্রী দেখতে গেলেন ঘটনার পাচদিন পরঅথচ ব্লগার রাজিবের বাসায় ঘটনার দিনেই দেখতে গেলেন!

তাহলে কি বলা যায়-রোম যখন পুড়ছিল নীরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন! সেরকম বিষয় একটা মিল রয়েছে? হেফাযত ইসলামকে রুখতে এই গরীব জনগোষ্ঠী গার্মেন্টকর্মী ২লাখ নারীদের ঢাকা মহাসমাবেশ করতে মনোবাসনা করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীঅথচ আজ সাভারের ভবন ধসের এ পর্যন্ত প্রায় পোনে চার শতাধিক অধিকাংশ নারীই হত্যার শিকার হলো, উদ্ধারের ২৫০৩ জনকে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হলোএদের দেখতে তাৎক্ষণিক যেতে পারলেন না তিনি

রাষ্ট্রপতি না হয় নতুন, কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো নতুন নয়তাঁর কিছু কথাবার্তায় আমাদের আক্কেলগুড়ুম হতে হলোতিনি বিবিসির সাক্ষাতকারে বললেন-একটি বিষয় আমার নজরে এসেছে-ওই এলাকায় মৌলবাদী বিএনপি এদের হরতালের জন্য আহবান জানাচ্ছিলআমাকে বলা হয়েছে, হরতাল সমর্থক কতিপয় ভাড়াতে সেখানে গিয়ে এই যে ভাঙ্গা দালান বা ফাটল ধরা দেয়াল ছিল, সে দেয়ালের বিভিন্ন স্তম্ভ এবং গেট ধরে নাড়াচাড়া করেএটিও এ ধরনের একটি ধসের সম্ভাব্য কারন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে

ওই যে ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন- তাঁরা দেশের মালিক, আইনের মালিক, এমনকি অধীনে কর্মরত শ্রমিকদের জীবন-মৃত্যুরও মালিকঠিক তাই, ভবনের মালিককে বাঁচাতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন শিশুসূলভ কথাবার্তা বলেছিলেনপরে অবশ্য কথা উল্টিয়েছেন, কিন্তু এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কথা যে ঘুরিয়ে ফেলা কতটা সহজ সেটা হয়তো তিনি জানেন না

ফেসবুকার মুহাম্মদ গোলাম নবী মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবিসির সাক্ষাতকারে ফেসবুকে স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেছেন-এই সেই মন্ত্রী যে সফটওয়্যারের বাংলা করেছিলেন কোমল সম্ভারআর হার্ডওয়্যারের বাংলা করেছিলেন কঠিন সম্ভারতাই কোমল সম্ভার খ্যাত মন্ত্রী স্তম্ভ ধরে নাড়াচাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছেন

ফেসবুকার আফরোজ শীলা লিখেছেন-একটি জাহাজ ডোবার জন্য একটি ফুটোই যথেষ্টএকটি রাজনৈতিক দলের ভরাডুবির জন্য একটি মখাই যথেষ্ট..মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও একই ভুল করে বসলেনসাভার পৌর যুবলীগ অফিস থেকে যুবলীগ কমিটির লিস্ট নিয়ে এসেছেনসেখানে রানার কোন নাম নেইবলে সংসদে সাফাই গাইলেন

কিন্তু সাভার জেলার সাংসদ মুরাদ জং এর সাথে হাজারও পোষ্টার, ব্যানার ও সাইনবোর্ডে রানার সাথে তার ছবি সংযুক্তআহবায়ক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেএক রঙিন ছবিতে দেখা গেছে সাংসদ মুরাদ জং রানাকে জড়িয়ে ধরেছেনআরেক ছবিতে কপালে চুমু খাচ্ছেননাকি এগুলো ছবি উন্নতমানের ফটোসফট্ সফটওয়্যারে তৈরি বলে অভিযোগ টানবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী !

অভিযোগ টানার কথাই, নইলে রানাকে বাঁচানো যাবে না? আইনের ফাঁকফোকর বের করে সে পদ্ধতি অবলম্বন করে রানাকে বাঁচাতে হবে হয়তো এমন চিন্তাও ঘুরপাক খাচ্ছে সাংসদ ও বিজিইএম এবং প্রশাসনেরযার কারণেই প্রকাশ্য দিবালোকে নিরাপরাধ বিশ্বজীৎ দাসকে রাজপথে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যার করার সুযোগ পায় ছাত্রলীগ নামক সংগঠন

অথচ সেদিনও ওইসব হত্যাকারীরা ছাত্রলীগের কেউ ছিলেন না মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই মুখ ফুটে প্রকাশ করেছিলেনসে সুবাদেই নরখাদক অপরাধীরা পার পেয়ে যানবিচারের আওতায় থাকেনপ্রেসব্রিফিংয়ে বড় বড় লোক বুলানো আশ্বাস দেওয়া সহজ; কিন্তু ভিতরে চলে ঘটনাকে নানা নাটকে রুপান্তরিত করার দূর্বার স্ক্রিপ্ট লেখার কার্যক্রম!!

সাভারের বিধ্বস্ত রানা প্লাজার ধসের স্তুপ উদ্ধারকারীদের কংক্রিটের কাটা এক একটা ফটক যেন নরকের ফটকযে ধ্বংস স্তুপ ফটকের ভিতর থেকে যারা বের করে আনছেন থেকে জীবিত ও মৃতদের পোশাক কর্মীদেরতারাই হাই নি:শ্বাস ছেড়ে বলছেন এটা যেন অন্ধকার কবরের চেয়েও ভয়ংকর রুদ্ধশ্বাস জায়গা! উদ্ধারকারীরা ধসে পড়া ভবনের বিভিন্ন অংশ কেটে ভিতরে ঢুকছেন আটকে পড়াদের উদ্ধারের উদ্দেশ্যে, মিনিট কয়েক পর সেখান থেকে বের হয়ে আসছেন অসুস্থ্য হয়ে

হা করে বাতাস গিলছেন আর বলছেন কঠিন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিনিজেরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছিনরকের চেয়েও কঠিন এই জায়গায় হাজার হাজার শ্রমিক আটকা পড়ে পিষ্ট হয়ে আছেনউদ্ধারকারীরা ভিতরে প্রবেশ করতেই অক্সিজেনের অভাবে দম বন্ধ হওয়ার জো হয়, তাহলে এই ভয়াবহ মৃত্যুকুপে যারা ঘন্টার পর ঘন্টা চাপায় পিষ্ট হয়ে আছেন, তারা কিভাবে সহ্য করেছিলেন! ফেসবুকে একজনের স্ট্যাটাসে দেখলাম, ভিতরে আটকে পড়া একজন পানি শুন্যতায় নিজের প্রসাব পর্যন্ত গিলেছেন

কী করুণ সে দৃশ্য! জীবিতদের কেউ তার পা কেটে উদ্ধার করার আকুতি জানাচ্ছে, কেউ হাত কেটে বের হতে চাইছেননিহতের মধ্যে অনেকের করুণ দৃশ্য লক্ষ্য করা গেছেএক নিহত নারী কর্মীর পায়ের নুপুর দেখা গেছে, কারও মাথা থেতলে রক্ত ঝরছে, কারও দুপায়ের রান চাপায় পিষ্ট হয়ে আছেএই করুণ দৃশ্যে যেন সাভারকে মৃত্যুনগরীই মনে হচ্ছে

মূলত ঝুকিপূর্ণ ভবনগুলোই হলো জীবন ধ্বংসের মৃত্যুর কারখানাধসে যাওয়া মানুষদের জন্য জীবন্ত কবর খুঁড়ে নারকীয় জায়গায় তৈরি করাএই ধ্বংস স্তুপে দেখতে হয় লাশের মিছিলহত্যার বধ্যভূমি২৪ নভেম্বর/১২ আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে পুড়ে ভস্ম হওয়া ১১৩/১১১ জন শ্রমিকের জীবদাহের নারকীয় স্থান বৈ কিছু ছিল না

তদ্রুপ ২০০৫ সালের মোহাম্মদপুরে স্পেকট্রাম গার্মেন্ট-এর ছয়তলায় টিনের ছাদে আগুনে পুড়ে ছাই হয় ৬৪ জন শ্রমিকগাজীপুরের গরীব এন্ড গরীব গার্মেন্টের কারখানায় আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় ২১ জনেরমোহাম্মদপুরে স্মার্ট ফ্যাশনসে আগুনে মারা যায় ৭ জন (তথ্য: প্র/আ.২৭ এপ্রিল) এবং সাভারের স্মরণকালের ভয়াবহ ট্রাজেডি ভবন ধসে ৩৬৩ও আহত এ পর্যন্ত ২৪৩৩জন জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে

এই যে শ্রমিক হত্যার মৃত্যুর ফাঁদ তৈরি করে হাজার হাজার শ্রমিক হত্যা করার পরও মালিকরা বারবার দায়মুক্তির বাইরে থাকছেনআদালতে তাদের বিচার করে নাপ্রশাসন, আদালত আর দেশের মালিকানা নাকি তাদের পকেটের ভিতর থাকে

তাই হয়তো সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ তার মালিকের জন্য দায়মুক্তি জাতির জন্য শোককলামে আক্ষেপ করেই লিখেছেন-নারায়নগঞ্জ প্যানটেক্স গার্মেন্টের মালিকের কিছু হয়নিচট্টগ্রামে আগুনে অঙ্গার অজস্র‌ শ্রমিকের মালিকেরও কিছু হয়নিতাঁরা দেশের মালিক, আইনের মালিক, এমনকি অধীনে কর্মরত শ্রমিকদের জীবন-মৃত্যুরও মালিকরাষ্ট্র যেন এই জীবন-মৃত্যুর মালিকের ম্যানেজার

তিনি আরেক জায়গায় লিখেন-আমাদের চোখের রেটিনায় যে মাংস পিন্ডরুপ মানুষের ছবি, আমাদের কি হবে? তাজরীন থেকে ফেরার কয়েক দিন নাকে লেগে ছিল পোড়া মাংসের ঘ্রাণসাভার থেকে ফেরার পর টের পাচ্ছি মৃত্যুর সোঁদা গন্ধ’(২৫এপ্রিল/১৩ প্র/আ.) জীবন হত্যার এরকম করুণ মৃত্যুর মিছিল আমাদের আরও দেখতে হবে হয়তো, যতদিন না রাষ্ট্র এই অর্থ পিশাচ শ্রমিকদের রক্তচোষকদের কঠিন শাস্তি দিতে না পারবেন


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন