রবিবার, ২ জুন, ২০১৩

সাভার ট্রাজেডি : এত কান্নার জল রাখি কোথায়?

114 বার পঠিত
‘স্যার জীবিত না হোক, অন্তত লাশটা ফেরত দিন’ গত ৩০ এপ্রিল দৈনিক সমকালের প্রথম পাতার প্রকাশিত হয়েছে এক নিরাপত্তাকর্মীর পা ধরে কান্নার জলে বুক ভাসানোর এক স্বজনের আহাজারি কান্নার ছবি! চোখে কত জল; এই ক’দিনের হাজার হাজার স্বজনের চোখে ঝরেছে যেন সাগরসম লবনাক্ত জল। বেদনার জল, আহাজারি বুকচাপরানো স্বজন হারানোর জল। ঠিক করেছিলাম আর কোন কলাম লিখবো না এই সাভার ট্রাজেডি নিয়ে। লিখতে বসলেই চোখে জলে চলে আসে। কলম-খাতার মিলনে মিশ্রিত হয় বেদনার ধূসর জল।
২৯ এপ্রিল ফেসবুকে এক ফেসবুকার স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন- আর লিখব না সাভার নিয়ে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি বারবার। ওই দুমরানো-মুচরানো বিধ্বস্ত ভবনের ভাঁজকরা কাগজের মত দৃশ্যটা দেখলে সহ্য করতে পারি না। রাতে ঘুমাতে পারিনা। চোখে ভেসে উঠে বিধ্বস্ত ভবনের উদ্ধারকরা সারি সারি লাশের ছবি। উদ্ধার করা আহতদের রক্তমাখা শরীরের ছবি। ভবন ধসার বিধ্বস্ত জীবনের ছবি’। তার এই স্ট্যাটাসে লাইক দিয়ে মন্তব্য করেছিলাম-‘আপনি লিখতে না চাইলেও চোখে ভেসে উঠবে সেই বিধ্বস্ত ভবনের চাপায় পড়া নিহতদের রক্তমাখা ছবি। আহতের নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সগুলো ছুটছে হাসপাতালের দিকে। হাজার হাজার স্বজন তাদের হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই পিষ্ট হওয়া দুর্ভাগ্যদের ছবি নিয়ে। এই স্মৃতির মন্থর দৃশ্য মুছতে পারবেন!’।
এই বেদনা গাঁথা শোক ভুলার নয়। যদিও সময়ের পরিক্রমায় আমরা ভুলে যাই। যেমনটি প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম গত বছরের তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিদগ্ধে নিহত হয়েছিল ১১১জন পোশাককমী। সেই পুড়ে যাওয়া মাংসপিন্ডের গন্ধ না সরতেই ধসে যাওয়া ভবনের পিষ্ট হওয়া ৫২৪ জন লাশের কর্পুর-সোঁদা গন্ধ নিতে হলো অপ্রত্যাশিত ভাবেই। তাজরীন ফ্যাশনের অগ্নিদগ্ধদের তথ্যচিত্রগুলো কিন্তু মুছে যায়নি। আর মুছে যাবেও না। এইসব মর্মস্পর্ষী ভয়াল ট্রাজেডির ঘটনা যুগযুগ ধরে সংবাদপত্রে, ইতিহাসের পাতায় কালো অক্ষরে আর্কাইভ হয়ে থাকবে। আগামী বছরে এই দিন আসলে টিভি মিডিয়ায় স্মৃতি শোলক প্রামাণ্য চিত্র তুলে ধরে জানিয়ে যাবে ২৬ এপ্রিল সাভারের ভয়াবহ ট্রাজেডি ভবন ধসে নিহত হয়েছিল পাঁচ শতাধিকেরও বেশি শ্রমিক। আহত প্রায় তিন হাজার। ধ্বংসস্তুপের চেহেরাটা সাংবাদিকের ভিডিও করা দৃশ্যটা দেখা যাবে দিবস পালনের মধ্য দিয়ে।


গত দুইদিন আগে শব্দনীড় ব্লগে ‘কি নামে ডাকবো’ শিরোনামে বন্ধু সাইক্লোন একটা পোষ্ট করেছিলেন। সেখানে মন্তব্য করতে গিয়ে ভেঙ্গে পড়ি আমিও। বারী সিদ্দিকীর সেই গানটির কথা মনে পড়ে যায়-‘আমার সোঁয়াচান পাখি, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি’। এরকমই অনেকের সোঁয়াচান পাখি মৃত্যুকুপে পড়েছিল গত কয়েকদিন।
গতকাল সোমবার উদ্ধারকর্মীরা উদ্ধার করতে পেরেছিলেন শাহীনা নামক এক কর্মীকে। কিন্তু বাঁচানো সম্ভব হয়নি, জীবনের কাছে হেরে গিয়ে নিথর হয়ে মাটির বুকে শেষ স্থান নিলেন। জীবনের এই করুণ মৃত্যু তাঁর প্রত্যাশা ছিল না। জীবনের বেঁচে থাকার তাগিদে এই ইট-পাথরের নির্দয় শহরের নয়তলা ভবনে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজ নিয়েছিল শাহিনার মত অনেকে। শাহীনার মত নারীরা অনেকের ঘরের সেই সোঁয়াচান পাখির মতোই। জীবনের করুণ বিচ্ছেদের দায় কার ওপর বর্তাবেন তারা?
আজ নিহতরা স্থান নিয়েছে অন্ধকার মৃত্যুকুপ নামক গোরস্থান ময়দানে। তারা এখন মৃত্যুপুরী বাসিনী। স্বজনের গৃহশুন্য সেই প্রিয়জনের। যে প্রিয়জন এই ঘরে, এই বিছানায় থাকতো। পুরো আঙিনা জুড়ে মুখরিত থাকতো তার পদচলে। বিশেষ কোন দিনে বাড়িতে এসে ধুমধাম করে আনন্দ ফুর্তি করতো। এদের জীবনে আর বিশেষ কোন দিন আসবে না। যে শিশুটি তার মাকে হারালো, সে তার মাকে ডাকলেও আর পাবে না। মা এসে তার বুকের দুধ মুখে তুলে দিবে না। যে ভাইটি তার বোনকে হারালো তাকে নিয়ে আর কখনো ভাই-বোনের যে মিছেমিছি ঝগড়া, পারাপারি, হুরোহুরি সেটা হবে না। যে বোনটি তার ভাইটিকে হারালো, সে আদরের ভাইটির আপু কিংবা বুবু ডাকটি শুনতে পাবে না। যে মা-বাবা তার সন্তানকে হারালো তিনারা আর কখনো এই করুণ শোকাহত ব্যথা সরাতে পারবেন না। বাকিটা জীবন চোখের জল ফেলতে ফেলতে বুক ভেসে যাবে মা জননীর বুক। পাথর হবে দুটি অশ্রুঝরা চোখ। আর যে স্ত্রী কিংবা স্বামী তার প্রিয় স্ত্রীকে হারালো তার একা থাকাটা বড় দু:ষহ মনে হবে। ঘরে ঢুকতেই স্বামীর বেচেরার স্ত্রীর মুখ ভেসে উঠবে। বিছানায় ঘুমুতেই গেলেই বামপাশের সঙ্গীটাকে আর পাওয়া যাবে না। বুক জুড়ে জেগে উঠবে তখনই দুমুরে মুচরানো কষ্ট। নীল ম্লানে পরিণত হবে তার মুখটা। হয়তো মনের কষ্টে উচ্চারিত হবে-আমার সোঁয়াচান পাখি, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি, তুমি আমি জনম ভরা, ছিলাম মাখামাখি’। এই মাখামাখির মধুরতম জীবনের সঙ্গীটাকে আর কখনো পাওয়া যাবে না বিছানার পাশে। যে কীনা ছিল সুখ-দু:খের সম-ভাগিদার।
আজ তাকে রাখা হয়েছে ওই নি:সঙ্গ গোরস্থানের অন্ধকার কবর নামক মৃত্যুগহবরে। কোন কোন স্বজন তার প্রিয়জনের লাশও পাননি। না পাওয়ার আফছোসে মুখে কাপড় দিয়ে বাঁধভাঙা কান্নার জল আটকাতে চেষ্টা করেছেন। চোখের জলে বুক সরাবর নদীর শ্রোতের মতো খাদ সৃষ্টি করেছেন। কান্নার ঢলে বর্ষার প্লাবন। তবে এ প্লাবন কোন কৃষকের রোপা লাগানোর জন্য উপযোগী ক্ষেত্রবিশেষ নয়। এ প্লাবন বেদনার নীলে বুক ফাটানোর আহাজারির ক্রন্দনের প্লাবন।
পত্রিকায় দেখলাম এক উদ্ধারকর্মী সেনাকর্মকর্তাও কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন। এই ছবিটা দেখে নিজেও চোখের জল না ছেড়ে পারিনি। চোখের জলের সাথে কারও ঝরে পড়ছে যন্ত্রনার আগুন, কারও বেদনার ঝরণার ফোয়ারা আবার কারও চোখের জলের সাথে খসে পড়ছে ত্রিকোনিষ্ট পাথর। পাথর ফেটেও এই ভয়াল ট্রাজেডির মর্মান্তিক মৃত্যুর করুণ দৃশ্য দেখেও জল বেরিয়েছে। এত শোক, এত কান্নার সমবেদনার ভাষা জানানোর জায়গা কোথায়?
বিধ্বস্ত ভবনের চারপাশে বাতাসে বাতাসে দুমড়ে মুচরানোর শব্দে ভেসে উঠছে করুণ গীতারের সুর। শুকনো পাতার ঝরে পড়ার মর্মর শব্দে নিহতদের নি:শব্দ আর্তনাত। সাভারের এই মর্মস্পর্ষী ট্রাজেডি নিয়ে গতকাল (৩০ এপ্রিল) দৈনিক সমকালের রির্পোটারের ডায়েরী ও সঞ্জয় পিয়ালের খেলার প্রতিবেদন ছিল হৃদয় নাড়া দেওয়া শব্দ-বাক্য অনুভব করার। চারদিকে শোকাহত নিমজ্জমান পরিবেশ। পুরো জাতির বুকের পাঁজরে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে এই ভয়াল বিপর্যের প্রাণনাশের করুণ চিত্র। হাজার হাজার স্বজন ভেজানো কাঁদাযুক্ত জমিনের ছবি। দেশের প্রতিটি অলিতে গলিতে শ্রোতের ন্যায় বয়ে গেছে শোকাহত কান্নার জলের শ্রোতে। অশ্রুপাতে সিক্ত হয়েছে গোটা বিশ্বও। বিশ্ব ‘থ’ হয়ে দেখেছে সাভারের রানা প্লাজার মহা বিপর্যের শিকারে পাঁচ শতাধিকেরও বেশি শ্রমিকের মৃত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
দুমরে মুচরে কাগজের ভাঁজের মতো রানা প্লাজা ভবন ধসে যাওয়ার পরেও সেখানে জীবনের সাথে লড়াই করেছে শাহীনার মতো মেয়েরা। উদ্ধারও হয়েছে আড়াই হাজারেরও উর্দ্ধে। এতসংখ্যক বিপুল প্রাণহানি দেশের ইতিহাসে এটাই সর্বরেকর্ড ভবন ধসে জীবন হারালো পোশাক কারীগর শ্রমিকরা। এই বিপর্যস্ত মৃত্যুর শোক ক্রীড়াঙ্গনেও ছাপ ফেলেছে। আহতবোধ হয়েছেন দেশের ক্রিকেট তারকা মুসফিক বাহিনী। এই আহতবোধের চিত্র ক্রীড়া প্রতিবেদক প্রিয় সঞ্জয় সাহা পিয়াল ‘সাভারের অশ্রুধারায় মিশে গেল জয়ের আনন্দ’ প্রতিবেদনে এভাবেই লিখেছেন-‘শোকে মুহ্যমান থাকলে কি কখনও উৎসব করা যায়? ক্রোধ, ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব যদি গ্রাস করে থাকে হৃদয়, তাহলে কি সেখানে অর্জনের গর্বে বুক ফোলানো যায়? যায় না বলেই গতকাল হারারেতে চার বছর পর বাংলাদেশ তার টেস্ট ইতিহাসের চতুর্থ জয়ের দেখা পেলেও খুব বেশি উচ্ছ্বাস দেখাতে পারেননি মুশফিকরা। প্রথম টেস্টের লজ্জার পর এদিন জিম্বাবুয়েকে দ্বিতীয় টেস্টে ১৪৩ রানে হারিয়েও প্রতিশোধের আস্ফালন দেখাননি কেউ। বরং তাদের এই সিরিজ ড্র করা জয়টি উৎসর্গ করেছেন সেসব স্মৃতির উদ্দেশ্যে, যারা সাভার ট্র্যাজেডিতে নিহত হয়েছেন মর্মান্তিকভাবে।
যারা এই জয় দেখে খুশি হতেন, মিছিল নিয়ে মাঠে নামতে পারতেন, যারা হাজার দুঃখের মধ্যেও এই ক্রিকেট দলের জয়ে একটু হাসি হাসতেন, তারাই যখন পৃথিবী থেকে নির্মম কষ্ট পেয়ে বিদায় নিয়েছেন, সেই তাদেরই ক্ষমাসুন্দরভাবে এ জয়টি উৎসর্গ করেছেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। ‘আমাদের একটি জয়ে যারা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়, বাংলাদেশের সেই ষোলো কোটি মানুষ আজ শোকের মধ্যে আছে। প্রথম টেস্টটি হারার পর তারাই বেশি কষ্ট পেয়েছিল। দ্বিতীয় টেস্ট জিতে আমরা যখন এই সিরিজ ড্র (১-১) করতে পেরেছি তখন এই জয় সাভার ট্র্যাজেডিতে নিহত শ্রমিকদের স্মৃতির উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করছি।’ শোকের নিমজ্জমান পরিবেশে হৃদয় গহীনে করুণ গীটারের সুরে রক্তসঞ্চালনের ভিতর প্রতিনিয়তই নাড়া দিয়ে যাবে ভয়াল ভবন গ্রাসে নির্মম শিকার হয়েছিল কয়েক হাজার পোশাকশিল্প শ্রমিক।
বারবার চোখ বুজলেই ভেসে উঠে বিপর্যস্ত ভবন ধস পিষ্ট হওয়া সেইসব ছবি, পায়ে নুপুর, হাতে সিটিগোল্ড কিংবা স্বর্ণের কাকন। অসুস্থ জীবনের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যায়িত আহতদের মুখ। ঘটনার শিকার বিভৎষ বর্ণনা করতে গিয়ে অনেকে চোখের জল ছেড়ে দেন। শেষ উদ্ধারের মৃত্যুর পথযাত্রী শাহীনার সংগ্রামটা দু’চোখকে প্লাবিত করেছিল। এক সেনাকর্মকর্তা হাউমাউ করে ঝরঝর করে চোখের জল ফেলছিলেন। সমকালের শাহাদত হোসেন পরশের ‘শাহীনার জন্য অশ্রুপাত’ প্রতিবেদন থেকে জানা যায় শেষ চেষ্টাটাও ব্যর্থ হতে হয়েছে। শাহীনাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। প্রতিবেদনে কয়েকটি জায়গায় শাহীনাকে উদ্ধার নিয়ে কীনা চেষ্টা করা হচ্ছিল। ‘রোববার রাতে তার কাছে (শাহীনার) পৌছেন উদ্ধারকর্মীরা এর পর হঠাৎ ভয়ংকর এক দূর্ঘটনা। রড কাটতে গিয়ে আগুনের স্ফুলিঙ্গ থেকে ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়ে অন্ধকার করে দেয় উদ্ধারকর্মীদের তৈরি করা সুড়ঙ্গ। মৃত্যুপুরী থেকে আকুতি জানিয়ে শাহীনা বলেছিলেন-‘হাত-পা কেটে হলেও আমাকে বের করুন। আমাকে রড কাটার দিন। আমিও রড কেটে জায়গা ফাঁকা করছি। আমার বাঁচ্চাটাকে একটিবার দেখতে চাই। ওকে দেখার আমি মরে গেলেও শান্তি পাব।’
উদ্ধারকর্মীরা মৃত্যুগহবরে তাকে অক্সিজেন ও স্যালাইন সরবরাহ করেন। দেওয়া রড কাটারও। শাহীনা নিজেও ধ্বংসস্তুপ সরিয়ে সহযোগিতা করেন উদ্ধারকর্মীদের। যারা লাশের ওপর দাঁড়িয়ে জীবনের সন্ধান করেছিলেন, অজান্তেই তাদের চোখের কোনা ভিজে উঠে। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে শাহীনার উদ্ধার অভিযানের খবর দেখে সারাদেশের কোটি মানুষও তার জন্য প্রার্থনা করেন। ফেসবুকে শাহীনার জন্য আবেগঘন লেখা পোষ্ট করা হয়। তবে সোমবার ২৯ এপ্রিল বিকেলে শাহীনাকে মৃত উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে চারদিকে নেমে আসে শোকের ছায়া। এই শোকের মুহ্যমান মুহুর্তে কাঁদবেন না কেন? আমাদের ব্যর্থতাই তোশাহীনাকে দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। ধ্বংসস্তুপের ভেতরে যে শাহীনা উদ্ধারকর্মীদের সরবরাহ করা খাবার খেয়েছেন, কথা বলেছেন স্পষ্টভাবে; এমনকি নিজ হাতেই বিম কেটে সহযোগিতা করেছেন উদ্দারকর্মীদের-অসতর্কতায় হারাতে হলো সেই শাহীনাকে’ (সমকাল : ৩০ এপ্রিল)। উদ্ধারকর্মীরা হাউমাউ করে কেঁদেছেন। যারা দেখতে গেছে তাদেরও চোখের কোনা ভিঁজে আঁচল স্যাঁতস্যাতে হয়েছে। হৃদপিন্ড উঠানামা করেছেন। আর স্বজনদের চোখের জলে ঝরণা সৃষ্টি হয়ে সারাদেশের কোটি কোটি চোখের জলে শেয়ার হয়েছে।
স্বপ্নজীবনের করুণ মৃত্যু! বেদনায় অশ্রুপাতে পুরো সাভার মৃত্যুনগরীতে বাতাসে শুধু শোকের গুঞ্জন। আজ লেখকের চিন্তার সাথে কলমে ঝরছে অশ্রুপাতের করুণ সাহিত্যের আঁচর। সাংবাদিকের চোখে দেখা রির্পোটে বর্ণনার ভিতর ফুঁটৈ উঠেছে বিয়োগান্ত তথ্য। গায়কের ভেঁজা কন্ঠে ঝরছে বেদনার গান। ফটো সাংবাদিকের ভিডিও ফুটেজে উঠেছে সাভারের রানা প্লাজা কাগজের মতো ভাঁজ হওয়ার দূদর্ষ প্রামাণ্যচিত্র। পত্রিকার পাতায় পাঠকের চোখে ঝরে আফসোছের জল। টিভিতে প্রচার এই দুদর্ষ বিপর্যের করুণ ভিডিও লাইভ সম্প্রচারে দর্শকের চোখে বেরিয়ে আসে অনায়েসেই ভিতরকার হৃদপিন্ড নড়াচড়ায় আবেগতাড়িত অশ্রু। সংবাদ উপস্থাপকের ভেঁজা কন্ঠে অন্তর জুড়ে ঝরে স্বজনদের কাঠফাঁটা রৌদ্রে দাঁড়িয়ে আর্তনাতের সমব্যথাতুর অশ্রু।
আর যারা ধসে পড়া ভবনের চাপায় পিষ্ট হয়ে আটকা পড়েছিলেন তাদের কান্নার বিকট চিৎকারে কেঁপে উঠেছিল ভূ-কম্পনের মতো আসমান-জমিনের মধ্যস্থানটুকু। আর যারা নিজেদের কথা না ভেবে উদ্ধার কাজে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন, মনটাকে পাথর করে উদ্ধার চেষ্টাতে চোখের জল আটকাতে পারেন নি। এই কান্নার জল রাখবো কোথায়? জমিনে রাখলে জমিনের ঘাস মরে যাবে। সাগরে ফেললে সাগর ফেঁসে উঠবে অত্যাচারিদের ধ্বংসের উদ্দেশে। পাহাড়ে নিক্ষেপ করলে সেও বিধ্বস্ত হয়ে যেতে চাইবে মনুষ্য কলঙ্কের দায় থেকে বাঁচতে।
তাহলে এই কান্নার জল রাখবো কোথায়? তাই ঠিক করেছি এই ভয়াল বিপর্যস্ত মৃতগহবরে চলে যাওয়া নিহতদের স্মরণে সমস্ত কান্নার জলগুলো কলমে ভরে নিলাম। এর প্রতিটি ফোঁটা দিয়ে সৃষ্টি হবে এক একটি স্মরণার্থ শব্দ। শব্দ দিয়ে বাক্য। গচ্ছিত বাক্যের সমাহারে সেটা রূপ নিবে স্মরণকালের এই ভয়াবহ ট্রাজেডির ৫ শতাধিকেরও বেশি নিহত গার্মেন্টকর্মীদের জীবন্ত ইতিহাস।
১ মে/২০১৩

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন