রাজনীতির দূরারোগ্য ব্যাধির আক্রান্তে ঝরে পড়ছে শতশত তাজা
প্রাণ; এই
সংক্রামক দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচার পন্থা কী?
রাজনীতির শরীরে আজ জায়গায় জায়গায় পচন ধরেছে। আক্রমণ করেছে মহামারি দূরারোগ্য ব্যাধি
কলেরা, টাইফয়েড, প্যারালাইসিস, ক্যান্সার, গুটি বসন্ত ও জলত্যাঙ্ক
নামক ভয়ঙ্কর রোগগুলো। রাজনীতির
মস্তিস্কে এই মহামারি রোগ এমনভাবে অ্যাটাক্ট করেছে যার কারণে মুসলিম উম্মাহর
আনন্দময় ঈদ ‘ঈদুল
আযহার কুরবানীর পশুর মতো জবাই উৎসব শুরু হয়েছে আজ দেশে! যার ফলে যেখানে সেখানে
দেখতে হচ্ছে গুলিবিদ্ধ লাশ,
জবাইকৃত
মাথাহীন মুন্ডু, রক্তাক্ত
নিথর দেহ। জলাত্যাঙ্ক বিষ প্রবেশ করেছে
রাজনৈতিকদের মস্তিস্কে। যার
কারণে পাগলা কুকুর স্বভাব ধারণ করে হত্যা উৎসবে মেতে উঠেছেন তারা। তা নাহলে রাজনৈতিক সহিংসতায় এত লাশের
স্তুপ দেখতে হবে কেন?
মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে যে
হত্যানাশকতার রূপ দেখতে হলো সেটা কারোরই প্রত্যাশা থাকার কথা নয়। গত ৫
মে পল্টনে বলা যায় ভয়াবহ সুনামিই ঘটে গেল। এই
সুনামির তান্ডবে দেশে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার চিত্র দেখে মনে হচ্ছে দেশ
ভয়াবহ দূর্যোগের দিকে হাটছে। অর্থনৈতিক
এই বিপর্যয়ের সাথে রাষ্ট্রের রাজনৈতিকদেরও যে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে, যার কারণে পবিত্র ধর্ম
নিয়ে চলছে নানা ফন্দিফিকির রাজনীতির। তা
নাহলে পবিত্র কুরআন পুড়ানো হবে কেন? পল্টনে
বায়তুল মোকারম মসজিদ মার্কেট ও হাউস বিল্ডিং (বিএইচএফবি) এর অফিস ১০তলা অফিসের ৪
তলা পর্যন্ত আগুন জ্বলে উঠবে কেন?
কেন
পল্টনের খোলা বাজারের বই দোকানগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিতে হবে?
গত ৬ এপ্রিল এই শাপলা চত্বরেই প্রথম বারের মতো হেফাজতে ইসলামের
মহাসমাবেশ দেখেছিলাম। সন্ধ্যার
পূর্বেই তারা সমাবেশ শেষ করে নিজ নিজ ঘরে ফিরে গিয়েছিলেন দেখে ভাল লেগেছিল। কিন্তু ৫ মে দ্বিতীয়বার সমাবেশে
দুপুরের পর হঠাৎ করেই এমন কী হয়ে দাঁড়ালো যে, দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু হয়ে গেল। রাস্তায় আগুন জ্বলানো হলো। গাড়ি পুড়ানো হলো এর কারণ কী? এর নেপথ্যে পিছনের দিকে
তাকালে বোধয় তৃতীয় কোন শত্রুপক্ষ এই দাঙ্গা-হাঙ্গামার সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন!
সরকারও বেশ ধৈর্য্যশক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন, বলেছিলেন হেফাজতে ইসলামের ভিতর কিছু জামায়াতের ইসলামের চক্র
প্রবেশ করায় এই হট্টগোলের সৃষ্টি। পল্টনের
দাবানলের সৃষ্টি। যা সন্ধ্যার দিকে চ্যানেল টোয়েন্টি
ফোর-এ লাইভ প্রচারে দেখেছিলাম,
পল্টনে
বায়তুল মোকাররম মার্কেট,
হাউজ
বিল্ডিং ও সিপিবি অফিসে জ্বলছিল সন্ধ্যার আধাঁরে বিভীষিকাময় আগুনের লেলিহান শিখা। তবে সন্ধ্যার পূর্বে সংবাদ সম্মেলনে
মাননীয় এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ আক্রোশ ভাষায় বলছিলেন-হেফাজতকে আর ছাড় নয়, হেফাজতরা যদি সমাবেশ শেষে
সন্ধ্যার মধ্যে ঢাকা ত্যাগ না করে,
তাহলে
জনসাধারনের জানমালের রক্ষার্থে সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে সরকার।
এদিকে হেফাজত ইসলামের প্রাণপুরুষ শাহ্ আল্লাম শফী সম্মেলনে যোগ
দিতে ঢাকা আসলেও ফের ফিরে যান লালবাগে। এর
কারণ অবশ্য জানা যায়নি। কেন চলে গেলেন? প্রশ্ন জেগেছে, কিন্তু উত্তর মেলেনি। মাননীয় এলজিআরডি মন্ত্রী ও আওয়ামী
লীগের সাধারন সম্পাদকের সন্ধ্যার পূর্বে ওই আক্রমণাত্মক ভাষণে একটু আশংকা জেগেছিলো
মধ্যরাতে মহামারি কোন ঘটনা ঘটে কীনা? আগুনের লেলিহান শিখায় চোখ রাখতে রাখতে বাসায় ফিরি রাতে
এগারটায়। বাসায় টিভি নেই; তাই পরের দিন ভোরের খবরের
আশা করে রাত্রিবাস করতে হলো। মনের
ভিতর ভয় জাগছিল দেশের বুকে একী দূর্যোগ শুরু হলো! এই ভয়ানক দূর্যোগের শেষ পরিণতি
কী? এর শেষ
কোথায়…………
দেশে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সৃষ্ট ঘটনাগুলো গতকালের ঘটনাকে
গোগ্রাসে গিলে ফেলছে। বেড়ে
যাচ্ছে তীব্র-হিংস্র সহিংসতা। যার
দরুণ দেশ ক্রমাগত ধ্বংসের খাদে দিকে পড়তে যাচ্ছে। এই চরম উত্তেজনার জন্য দায়ী আজকের
সহিংস রাজনীতি। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজী নয়। সংলাপ নামে শুধু শুধু প্রেসব্রিফিং, সংবাদ সম্মেলন। গত ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে এ
পর্যন্ত সাড়ে ছয় শতাধিক নিহতের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার মধ্যে গত ৫ মে’র ঢাকা জুড়ে হেফাজতে
ইসলামের মহাসম্মেলন ঘিরে যা ঘটে গেল, তা বলা অপেক্ষা রাখে না দেশ এখন দু:সময়ের মুখোমুখিতে অবস্থান
করছে। সৃষ্ট এই মহা সংকটে ভেঙ্গে পড়ছে দেশের
অর্থনৈতিক অবকাঠামো, জানমালের
বিপর্যস্ততায় তীব্র বিভীষিকাময় অন্ধকারে নিমজ্জমান।
জনসাধারনের জানমালের নিরাপত্তার বদৌলতে নৈরাজ্যের মৃত্যুর ফাটল
সৃষ্টি করা, হত্যা
উল্লাস নিয়ে ঢোল পেটাচ্ছে আজকের নষ্ট রাজনীতির বাদ্যযন্ত্র বাদকরা। আর যে দেশে লাশের রাজনীতি চলে সে দেশে
জীবনের মূল্য কতটুকু থাকতে পারে সেটা প্রকাশ করার মতো নয়। সাভারের রানা প্লাজায় ধসে নিহত লাশ
গুমের অভিযোগ উঠেছিল সেটা পত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলে জানা গেছে। ৬ মে দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত
হয়েছে সারাদেশের হেফাজতের তান্ডব! টিভির দর্শক হিসেবে আমরাও দেখেছিলাম পল্টনের
দাবানলের লাইভ প্রচারের ঘটনাস্থলের সরাসরি ভিডিও চিত্র। হেফাজতিদের বিশাল সমাগমে ভরপুর ছিল
মতিঝিল শাপলা চত্বর। ঢাকার
প্রধান ৬টি স্থানে তারা অবরোধ করে রাখার ঘোষণা ছিল পূর্ব থেকেই। তাহলে এই অবরোধে যান চলাচল করলো কীভাবে
সেটাও প্রশ্ন ? তাহলে
কী এই শ্রেণীরা অবরোধের বিরুদ্ধচারী ছিল? খবরের কাগজে,
ফটোসাংবাদিকের
ভিউিও ফুটেজে দেখা গেছে-পল্টনের ফুটপাতে বসা ৮২টি বইয়ের দোকানে আগুন দিয়েছে
হেফাজতে ইসলামীর কর্মীরা। এইসব
বইয়ের স্টলে পবিত্র গ্রন্থ কোরআনও ছিল! সেগুলোও পুড়ে গেছে। অনলাইনে ফেসবুকে এ নিয়ে নানা
স্ট্যাটাসে লক্ষ্য করা গেছে-হেফাজতিরা কুরআন পুড়ে দিলেন শেষ পর্যন্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো-যারা ইসলাম বিদ্বেষ
তথাকথিত নাস্তিক ব্লগারদের কুরআন ও
সর্বকালের মহামানব মুহম্মদ (স.)কে অবমাননার জন রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে, তারা কী করে কুরআন
জ্বালিয়ে দিবে ? আমি
ফেসবুকে একজনের পোষ্টে কমেন্ট করেছিলাম-নিশ্চিত এর পিছনে তৃতীয় কোন গোষ্ঠীর হাত
রয়েছে। অবশ্য তথ্য বেরিয়ে আসবে পরে, আপাদত অপেক্ষা করতে হবে
সেই সময়ের জন্য। পবিত্র কালাম কুরআন পুড়ানোর জন্য সেইসব
চক্রকে অবশ্যই কঠিন শাস্তি পেতে হবে। এই হীন
কাজটা যে হেফাজতিরা করবে একজন মুসলমান হয়ে বিশ্বাস করতে পারছি না। কেননা কুরআনই যাদের শিক্ষা, আদর্শ; সেই কুরআনকে তারা পুড়িয়ে
দিবে এটা বিশ্বাস করা অসম্ভব!
আজকাল অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুক বিশ্ব মিডিয়ায়
ব্যাপক আলোচিত হয়ে উঠেছে। মিশরের
সেই কায়রোর তাহরীর স্কয়ার আন্দোলনের সূচনা করেছিল এই ফেসবুক। এরপর বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো
বাংলাদেশেও ৬ ফেব্রুয়ারি/ যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার বিচারকে কেন্দ্র করে ঢাকা
শাহবাগ তাহরির স্কয়ার হিসেবে প্রজন্ম চত্বর বিশ্ব গণমাধ্যমে আলোচিত হয় এই ফেসবুক
ঘিরেই। পরিচিতি লাভ করে ব্লগার এন্ড ফেসবুক
নেটওয়ার্ক অ্যাক্টিভিটিস্ট ফোরাম নামক অন্তর্জাল সংগঠন। সেই সূত্রে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে
এই অনলাইন সাইটটির পরিচিতি। আর নব
পরিচিতি লাভ শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট হয় এক জটলা। নতুন ভাবে উদ্ভাব ঘটে হেফাজত ইসলাম
বাংলাদেশ নামে আরেক ইসলামী দল।
শাহবাগে সৃষ্ট প্রজন্ম চত্বরে নারী-পুরুষের অবাধ সঙ্গ, দিন-রাত অবস্থান এবং
অনলাইনে কিছু ব্লগার মহানবী (সা.) কে কুটুক্তি করার কারণে শুরু হয় ‘নাস্তিক ব্লগার’ শব্দ-বাক্য ঝড়। এবার শুরু হয় অনলাইন সাইবার যুদ্ধ। সেদিক থেকে ফেসবুক ও ব্লগ হয়ে উঠে
সময়ের সবচেয়ে আলোচ্য বিষয়। নাস্তিক
ও আস্তিক ঘিরে বিস্তর লেখালেখি। যার
ফলে ফেসবুক হয়ে উঠে মাল্টিমিডিয়ার খুদে বার্তার সংবাদ পরিবেশক। এই অন্তর্জাল জগতে বাস করে কিশোর থেকে
শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। নানা
মানুষ ভিন্ন ভিন্ন মত ও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর ফেসবুক ব্যবহারকারী।
ফেসবুক শুধু সামাজিক যোগাযোগ সাইট হিসেবে নয়, এখানে রয়েছে
সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যম,
অনলাইন
ও প্রিন্ট মিডিয়ার নানা খবরের আপডেট পোষ্ট, বিভিন্ন সংগঠন ভিত্তিক গ্রুপ এবং বহু পেজ। এসব গ্রুপ ও পেজে তারা তাদের মতামত খুদে
বার্তা রূপে প্রকাশ করে থাকে। দিনের
যাত্রা থেকে শুরু করে টুকিটাকি যা কিছু করা হচ্ছে অর্থাৎ জীবন গৃহস্থালির বিষয়াদি
তুলে ধরছেন ফেসবুকাররা। তার
সাথে যুক্ত হয়েছে মাল্টিমিডিয়ার ইলেক্ট্রনিক নিউজ শেয়ার, স্ট্যাটাস ও কঠিনসব জ্ঞান
নির্ভর কমেন্ট, প্রবন্ধ/নিবন্ধ, জানা-অজানা বিশাল
তথ্যভান্ডার ও প্রতি মুহুর্তে ঘটে যাওয়া খবর সমূহ। গত ৫ মে রাত ১২ টা পর্যন্ত ও ৬ মে মধ্যরাতের পর থেকে কি ঘটেছে সেটাও উঠে
এসেছে ফেসবুকের পেজে। ভোরে
বন্ধ করে দেওয়া হলো ইসলামি টিভি ও দিগন্ত
টিভি দুটো চ্যানেল। কেন
বন্ধ করা হলো- উত্তর আসে বিআরটিসির উপরের নিদের্শসূত্রে। এই বন্ধ হওয়ার পিছনে রহস্য কী মধ্যরাত?
অনেকেই হয়তো আতঁকে উঠলেন কেন মধ্যরাত শব্দটি এমন আচমকা
তুললাম! টিভিতে যখন তেমন কোন খবর পাচ্ছিলাম না; তখন অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ফেসবুককেই ভরসা করতে হলো আমাকে, রাতে কোন ঘটনা ঘটেছিল কীনা? ফেসবুকে লগিন করেই আঁতকে
উঠলাম-বিশেষ কিছু পেজ দেখে। অনেকের
স্ট্যাটাসে জানতে পারলাম মধ্যরাতে মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে হেফাজত ইসলামকে হটিয়ে
দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কীভাবে
তাড়ানো হলো প্রশ্ন জাগলে এক ফেসবুক থেকে জানা গেল প্রচুর গোলাগুলি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে এই গোলাগুলিতে নিহতের লাশ
গুম করা হয়েছে! অনলাইন নিউজ ঢাকা টাইম ‘হেফাজত হটাও অভিযান হল যেভাবে’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে জানা যায়-‘মধ্যরাতে আইনশৃংখলা
বাহিনীর সাড়াশি অভিযানে পন্ডু করে দেওয়া হয় হেফাজতের কর্মসূচি। এই সাড়াশি অভিযানে ব্যবহার করা হয়
শতশত টিয়ার সেল, রাবার
বুলেট ও গুলি এবং সাজোয়া যানসহ সব ভারি অস্ত্রসমস্ত্র। এই অভিযানে অংশ নেয় কয়েক হাজার পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি জোয়ান।
অভিযানের ভোর পাঁচটার দিকে মতিঝিল চত্বরে দেখা গেছে, বিভিন্ন জায়গায় রক্তের
দাগ লেগে আছে, চারদিকে
এলোমেলো পড়ে আছে জায়নামায,
ছেঁড়া
জুতা, পাউরুটির
প্যাকেট আর ব্যাগসহ নানান ধরণের জিনিস পত্র। সেখানে
ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে রাবার বুলেটের খোসা, টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট। শতশত আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা
এলাকাটিতে অবস্থান করছেন।’ ফেসবুকে আরেকজনের
স্ট্যাটাসে দেখলাম-৭১’এর ২৫
মার্চের মতোই বর্বরতার ঘটনা ঘটেছে এই শাপলা চত্বরে। কী ভয়ানক খবর! তাহলে শাপলা চত্বরে তো
হাজার হাজার হেফাজত কর্মীর অবস্থান ছিল। তারাও
এই নারকীয় ফায়ারিং থেকে বাঁচলো কীভাবে? নাকি কত সংখ্যক এই হত্যার শিকার হয়েছেন? প্রশ্ন জেগে উঠে- কী বিকৃত
ঘটনার জন্ম দিল সরকার। এই জন্যই কি টিভির মুখ বন্ধ করতে দিগন্ত
ও ইসলামি টিভি চ্যানেল দুটি বন্ধ করে দিল?
অনলাইন ঢাকা টাইম থেকে আরও জানা যায়-‘হেফাজতের এক কর্মী আব্দুল
মালেক জানান, রাত
সোয়া দুইটার দিকে যাত্রাবাড়ির দিকে রাস্তা খোলা রেখে সমাবেশের চারপাশ দিয়ে
আক্রমণ করে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা
সমাবেশের মূল মঞ্চসহ সমাবেশের সকল জায়গায় এক সাথে গুলি, টিয়ারসেল ও বোমা নিক্ষেপ
করতে থাকে। এ সময় হেফাজতের অনেক কর্মী ঘুমন্ত
অবস্থায় ছিলেন। তারা কি করবে বুঝে উঠতে না পেরে
দিকবিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। অনেককে
গুলি খেয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। অনেকে
আশেপাশে গলি দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিছুক্ষণের
মধ্যেই সমাবেশ স্থল ফাঁকা হয়ে যায়।’ ফকিরাপুলের বসবাস করা
আব্দুল্লাহ বলেন, রাতে
হঠাৎ গুলির বিকট শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। মনে
হচ্ছে যেন কোন যুদ্ধের ময়দানে আছি।
মাঝে মাঝে বোমার বিকট শব্দ ভেসে আসে। লোকজনের চিৎকারে যেন এলাকাটি ভারি হয়ে
উঠেছে। লোকজন বিভিন্ন বাসায় এসে আশ্রয়
প্রার্থনা করেন। তবে ভয়ে অধিকাংশ বাসার লোকজন দরজা
খুলেনি। তবে বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় ও সিঁড়িতে
আশ্রয় নেয় হেফাজত কর্মীরা’। ঢাকা টাইমের এই খবর ধরতে গেলে মতিঝিলে
হেফাজতকর্মীদের ওপর যেন ২৫ মার্চের বর্বরতার মত তান্ডব হতে পারে এই আশংকা মোটেই
কাটানো সম্ভব নয়; তবে ৮
মে দৈনিক সমকালে ‘মৃতের
সংখ্যা নিয়ে অপপ্রচার’ প্রতিবেদন
দেখে একটু আশ্বস্ত হয়েছি। এ
প্রতিবেদনে জানা গেল- পল্টনে সংঘর্ষে ও মধ্যরাতে যৌথবাহিনীর অভিযানে ২২ জন নিহত
নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়, সমাবেশে আসা বিপুল সংখ্যক হেফাজতকর্মীদের মতিঝিল শাপলা চত্বর
থেকে হটানোর উদ্দেশ্যে রাতের অন্ধকারে বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে কেন সাজোয়া
যান, শত শত
রাবার বুলেট, গুলি
আর কয়েক হাজার কেন আইনশৃংখলাবাহিনী নিযুক্ত করা হলো? পত্রিকায় ২০ মিনিট
রুদ্ধশ্বাস সাঁড়াশি অভিযান এর কথা বলা হলেও, ভোর পর্যন্ত নাকি এই অভিযান অব্যাহত ছিল! এর মধ্যে কোন কারচুপি
আছে কীনা, সেটা
অবশ্য স্পষ্ট নয়। এই
তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কোন তথ্যই যেহেতু গোপন থাকে না, তাই এই মধ্যরাতে যৌথবাহিনীর অভিযানে কোন নৃশংস হত্যা কিংবা
হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল কীনা?
এই
গোপন রহস্য অবশ্যই উঠে আসবে। যদি এই অভিযানে কোন নিহতের খবর না
পাওয়া যায়, তাহলে
যৌথবাহিনীর চালানো অভিযানকে ভূয়সী প্রশংসার সাথে শ্রদ্ধাও জানাবো।
রাজনীতির ফর্মূলা যদি ভূল থাকে তবে সেটা বিশাল ক্ষতির কারণ
হয়ে দাঁড়ায়। যে ক্ষতির চিহ্নটা দেখতে হলো হেফাজতে
ইসলামের মতিঝিল শাপলা চত্বরের মহা সমাবেশ ঘিরে। গত ৬ এপ্রিল শান্তিপূর্ণভাবে তারা
সমাবেশ সফল করতে পারলেও ৫ মে তাঁরা ব্যর্থ হলো। সবচেয়ে ভুল হয়েছে শাপলা চত্বরের
রাত্রেও অবস্থান নেওয়া। দুপুর
বারটার পর থেকে যে সহিংসতার সূত্রপাত হয়েছিল-যার ফলাফল দেখতে হলো পল্টন এলাকা
জুড়ে ভয়াবহ আগুনের লেলিহান শিখা। সেই
আগুনে পুড়ছিল পল্টনের রাস্তার ধারে বসা বই স্টলগুলো। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় পাঁচ
শতাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ৭ মে
বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক
সমকাল এই পল্টনের দাবানল অগ্নিশিখাকে ‘সুনামি’বলে
উল্লেখ করেছে। ঘটনার দ্বিতীয় দিনে পল্টন, মতিঝিলে যে চিত্র দেখা
গেছে সেটা যেন সুনামির মতোই মানব সৃষ্ট দূর্বিপাকের মহা দূর্যোগ। চারদিকে বাতাসে ছড়াচ্ছে পোড়া পোড়া
গন্ধ।
দুইদিন আগে সাভারে রানা প্লাজা ধসে চাপা লাশের গন্ধ এখনো
ছড়াচ্ছে প্রকটভাবে। এর
সাথে যুক্ত হলো মার্কেট, পুলিশের
পিকআপ, মোটরসাইলে, ভারি যানবাহন পোড়ানো গন্ধ। এই বিভৎষ গন্ধে জীবন যেন হয়ে উঠছে
দুষণীয় বর্জ্যস্তুপ। তাই
হয়তো এ যুগের আলোচিত লেখক আনিসুল হক বিরাজমান পরিস্থিতির আলোকে লিখেছেন নিবন্ধ-
কোথাও কোন সুসংবাদ নেই (প্র/আ. ৭ মে) কথাটি তিনি ঠিক বলেছেন। যেদিকে তাকাই সেদিকেই বিপদের
মর্মস্পর্শী ও গন্ধ। বিপদের
ভয়াল গ্রাস আমাদের প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তাই কোন সুসংবাদ নেই দু:সংবাদ ছাড়া। তবে বলবো ৫ মে হেফাজত ইসলামের সমাবেশ
পালনে ফর্মূলার কিছু ত্রুটি ছিল।
ত্রুটিগুলো ছিল এরকম-
১.মতিঝিলের শাপলা চত্বরে রাতে হেফাজতিদের অবস্থান নেওয়া ঠিক
হয়নি। ২. যেহেতু শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ
সরকারের সমর্থন থাকলেও হেফাজতে ইসলামের পক্ষে তো সরকারের সমর্থন ছিলো না, কারণ সেটা প্রতিপক্ষরূপে
দেখা হয়েছে হেফাজত ইসলামকে সে কথা মাথায় রাখা দরকার ছিল ৩. যেহেতু হেফাজতে
ইসলামে অরাজনৈতিক দল, সে অর্থে
সরকারকে পালানোর প্রসঙ্গে হুমকি-ধামকি দিয়ে আক্রোশ করে তোলা ঠিক হয়নি, কারণ নির্বাচিত সরকার
একদিন সময় থাকতেও যে তারা ক্ষমতা ছাড়বে না, তাছাড়া দেশের বিরোধীদলগুলো তো আন্দোলন কম করছে না; সেটাও দেখার প্রয়োজন ছিল।
এই যে তিনটি ভুল, তার মাসুল দিতে হলো প্রচন্ডভাবে। এ পর্যন্ত এই সমাবেশ ঘিরে
বিজিবি-পুলিশসহ ২৩ জনের ইট-পাটকেল ও গুলিবিদ্ধ লাশ। আর সরকার রাতে অন্ধকারে বিদ্যুত সংযোগ
বিচ্ছিন্ন করে মধ্যরাতে ‘পত্রিকায়
এসেছে ২০ মিনিট সাঁড়াশি অভিযানে’
মতিঝিলকে
হেফাজত মুক্ত করে ফেলল গোলাবারুদ,
টিয়ার
সেল ও সাজোয়াযান ব্যবহার করে। এই
সাঁড়াশী অভিযানে কতসংখ্যক আহত-নিহত হয়েছে তা এখনো অজানা। কেননা রাতারাতি দুটি টিভি চ্যানেলসহ সব
টিভির মুখ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাই
বারবার প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মধ্যরাতের ঘটনাকে অনেকে ৭১’এর ২৫মার্চের বর্বরতার
কালো রাতের সাথে তুলনা করে মন্তব্য করেছেন। এই
ধারণাকৃত মন্তব্য যদি সত্যি সত্যি সত্যরূপে প্রকাশ পায়, তাহলে ইতিহাসের কালো
অধ্যায়ে রচিত হবে প্রাণঘাতক রাক্ষসী ছিল ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার।
আর যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তাহলে বুঝবো হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নামে এক উগ্রপন্থি ধর্মীয়
দল ধর্মের নামে এদেশে অশান্তি সৃষ্টি করেছিল। ধর্মকে পুঁজি করে রাজধানী ঢাকায়
মতিঝিলে শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশ করে যে সরকার কে ১৩ দফা দাবি চাপিয়ে দিয়েছিল, সেটা অমূলক ও
স্বার্থপ্রণোদিত। ধর্মকে লাঞ্চিত করতেই ৫ মে পল্টনে যে
ভয়াবহ তান্ডব করে কোটি কোটি টাকা অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটাতে ও পবিত্র কুরআনকে
অবমাননা করতেই এই উগ্রপন্থি আন্দোলন তারা করেছিল।
রাজনীতির এই দুরারোগ্য মহাব্যাধি থেকে আমাদের মুক্তি কী ? কোথায় পাব এর সুচিকিৎসা? কোথাও কি কোন ভাল খবর নেই ? জাতির জীবনে এই শনির
আক্রোশ দূর করার কি কোন পন্থা নেই?
নাকি
সময়ের ঘড়ির কাটা ধরে অপেক্ষা করতে হবে মৃত্যুর পেয়ালার জন্য। কখন আমাকে বলির পাঠা হতে হবে? কখন নষ্ট রাজনীতির ছড়িয়ে
দেওয়া বিক্ষিপ্ত দাবানল আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্মিভুত হতে হবে। কখন ভবন ধসে চাপা খেয়ে মরার জন্য
প্রস্তুত থাকতে হবে। এ জাতির জীবনে যেহেতু জীবনের মূল্য নেই; গুম-হত্যার শিকার হলে
মানবতার বিচার নেই; হত্যার
পর শুরু হয় লাশ নিয়ে রাজনীতি। লাশ
গুমেরও চেষ্টা চলে, হত্যাকৃত
লাশের যেন কত দাম! লাশের দেহের বিভিন্ন পার্টস-এর অর্থ সংগ্রহ করতেই চলে নানা
ফন্দিফিকির। লাশটা কিভাবে গুম করে পোষ্টমর্টাম করে
কাংখিত পার্টসগুলো রেখে বাকিটুকু কোথায় লুকানো যায়, পুড়িয়ে ভস্ম করে ফেলা
যায়।
এদেশে যেন লাশেরই দাম বেশি, জীবনের নয়। তাই
হয়তো কবি জীবননান্দ দাস ঠিকই বুঝেছিলেন-‘অদ্ভূত আঁধার এসেছে পৃথিবীতে’। ‘জাতীয় পতাকায় খামচে ধরেছে পুরোনো শকুন’ শামসুর রহমান ঠিকই
বলেছিলেন। ড.আকবর আলী খান গত ৫ মে বাংলাভিশন
টিভিতে ‘ফ্রন্টলাইন’টকশোতে আক্ষেপ করে বলে
উঠলেন-‘বাংলাদেশের
জন্মের সময় মনে হয়েছিল দেশটি প্রাকৃতিক দূর্বিপাকের দেশ। এই প্রাকৃতিক দূর্বিপাক ঝড়-ঝাঞা নিয়ে
গত ৪০ বছরে আমরা অনেক কিছু এগিয়েছি। আজ মনে
হচ্ছে প্রাকৃতিক নয়, মনুষ্য
সৃষ্ট দূর্যোগের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পৃথিবীতে সর্বোচ্চ স্থানে আছে। আমরা অদ্ভূত এক দেশে বাস করছি’। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে প্রয়োজন সমস্ত
সহিংসতা ছেড়ে হাতে হাত রাখা। দেশটাকে
যে অর্থে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জন করা হয়েছিল, সেটার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে
দেশের সব রাজনৈতিকদের এই দূরারোগ্য মানবিক ব্যাধি থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।
এই পল্টনে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দেখা গেছে-দৈনিক প্রথম আলোর
অর্থনীতি ও বাণিজ্য পাতায়‘ধ্বংসযজ্ঞের
স্বাক্ষী হাউস বিল্ডিং’ প্রতিবেদনে
বিএইচবিএফসি তথ্যমতে- এ সহিংস ঘটনায় সব মিলিয়ে ১৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা ক্ষয়ক্ষতি
হয়েছে। ভবনের অবকাঠামো ক্ষতি ১৭ কোটি টাকা। দুটি ভস্মিভূত, ১০টি গাড়ী ভাঙচুরে ক্ষতি
১ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
পল্টনে ফুটপাতে ৩৮টি বইয়ের দোকান পুড়ে অনীল বিশ্বাসের প্রায়
লাখ টাকার বই পুড়ে ছাই হয়,
‘গ্রামীণ
কার্পেট হাউজ’ এর
ভিতরে ৮০-৯০ লাখ টাকার কার্পেট পুড়ে ছাই, মতিঝিলের সরকারি কর্মচারীদের ৫৩ টি গাড়ী পুড়ানো হয়েছে।
পল্টনে মুক্তি ভবনও তান্ডবের শিকার হয়ে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি
হয়েছে।
এই
মুক্তি ভবনে ৫ ও ৬ তলায় ছিল সিপিবির কার্যালয়। এই ভবনে বেজমেন্টে থাকা দুটো মাইক্রোবাস, তিনটি ব্যক্তিগত গাড়ি ও
ভবনটির ১৪ টি দোকানের সবকটি পুড়ে গেছে। পাঁচতলা
পর্যন্ত সিঁড়ি পুড়ে গেছে। নষ্ট
হয়ে গেছে লিফট। বিশাল জেনারেটর আগুনে পুড়েছে। এই ভবনের ‘স্মৃতি পাথর ঘর’-এর মালিক সিরাজ উল্লাহ’র দাবি তাঁর অন্তত ১৩ লাখ
টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে ওই দিনের হামলায়। (সূত্র: প্র/আ. ৮ মে. পৃষ্ঠা-১৩,১৪ ও শেষ)। এই যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও প্রাণনাশের
ক্ষয়ক্ষতি কী দিয়ে পূরণ হবে?
এর
থেকে কি পরিত্রাণের কোন রাস্তা নেই?
সহিংসতা
শুধু ধ্বংসই এনে দিতে পারে,
কল্যাণ
নয়